মামুনুল হক কান্ড; ফেইসবুক সাংবাদিকতা বনাম গণমাধ্যম

সোনারগায়ে একটি রিসোর্টে হেফাজত নেতা মামুনুল হকের ঘটনাটির পর অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন এই ধরনের একটি ঘটনা মুলধারার গণমাধ্যমে আদৌ রিপোর্ট হওয়ার মত বিষয় কিনা? তাদের লেখার ধরনে মনে হয়েছে, এটি একটি স্বাভাবিক ঘটনা। কারো স্ত্রী বা বান্ধবি নিয়ে কেউ কোনো হোটেল বা রিসোর্টে যেতেই পারেন। এটা তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। এই ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিষয়টি নিয়ে কারোরই আপত্তি থাকবার কথা নয়। এখন প্রশ্ন হলো, এইটা মুলধারার সংবাদ মাধ্যম বিশেষ করে টিভিতে রিপোর্ট হওয়ার মত বিষয় কিনা! আমি বলবো অবশ্যই রিপোর্ট হওয়ার মত বিষয়। কি কারনে বিষয়? প্রতিদিন ঐ হোটেলে বা রিসোর্টেতো আরো কত মানুষ বেড়াতে যায়। রাত্রি যাপন করে। আনন্দ ফুর্তি করে। তাদের নিয়ে কেনো রিপোর্ট হলোনা? মামুনুল হককে নিয়ে কেন হলো? কারণ মামুনুল হক বর্তমান সময়ে সবেচেয়ে কাটতি নিউজ আইটেম। বিশেষ করে ফেইসবুক আর ইউটিউবে যারা ধমীর্য় বিষয়ে নিয়ে বুদ হয়ে থাকেন তাদের কাছে।
কারণ মামুনুল হকের একটা বক্তব্য বা লাইভ ফেসবুক বা ইউটিউবে আপ হলে তা ঘন্টা খানেকের মধ্যেই ভাইরাল, কখনো বা আলট্রা ভাইরাল হয়ে যায়। তাহলে এমন একজন ব্যক্তি যখন একজন নারীসহ দামি রিসোর্টে গিয়ে সময় কাটাবেন তখন সাধারণ মানুষ হোক কিংবা সাংবাদিক সবারই কিন্তু তার প্রতি আগ্রহ থাকবে তা নিয়ে সন্দেহ নাই। তাই এটি মানুষের চাহিদার নিরিখে একটি বড় খবর।

দ্বিতীয়ত, মামুনুল হকের এই ঘটনার পর শত শত হেফাজত কমীর্ সেখানে গিয়ে মামুনুল হককে ছিনিযে নিয়ে এসেছেন। একজন সাধারণ মানুষ যদি এভাবে কোনো ঘটনার সম্মুখীন হতেন, তাহলে তাকে উদ্ধার করতে কি এভাবে কেউ সেখানে আসতো? মনে হয়না। ফলে যদু—মদুর হোটেলে গিয়ে মেয়ে নিয়ে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা আর একটি ধমীর্য় সংগঠনের একজন শীর্ষ নেতার হোটেলে নারী নিয়ে বেড়াতে গিয়ে অপ্রীতিকর ঘটনা এক জিনিস না। ফলে, এটা নিয়ে মুলধারার গণমাধ্যমও নিউজ করবে এটাইতো স্বাভাবিক।
অনেকেই বলছেন, এটি হলো সুরসুরি দেওয়া সংবাদ, চুলকানি সংবাদ। কেউ আবার বলছেন এজেন্সির সাপলাই করা সংবাদ। আমাদের অনেক সংবাদকমীর্কেও এমন মন্তব্য করতে দেখা গেছে। সবগুলোই ঠিক আছে। সংবাদটা যে মানুষের আগ্রহের শীর্ষে ছিল তা বোঝা যায় এনিয়ে যেসব ভিডিও ও সংবাদ প্রকাশ হয়েছে তার ভিউ এবং হিট দেখলেই।
মামুনুল হককে যখন হেফাজত কর্মীরা ছিনিয়ে আনে তখন সেখান থেকে একজন ব্যক্তি ফেসবুকে লাইভ করছিলেন হেফাজত কমীর্দের পক্ষে। ঐ সময় একসাথে ভিডিও দেখছিল প্রায় ৪১ হাজার মানুষ। কোনো ফেসবুক লাইভে এই ধরনের একসাথে এতো মানুষের ভিডিও দেখার দর্শক কিন্তু অনেক বিখ্যাত গণমাধ্যমও পায়না। ফলে যকোন কর্নার থেকেই হোক ঘটনাটির প্রতি মানুষের কৌতুহল ছিল তুঙ্গে। ঐ ফেসবুক লাইভ যিনি করছিলেন তিনি বার বার প্রশ্ন করছিলেন, এতো হাজার হাজার মানুষ এখানে এসেছে তাহলে একটা মিডিয়াও নাই কেন? টেলিভিশন নাই কেন? কেনো এখন মিডিয়াগুলো এটা দেখাচ্ছেনা?

এবার আসা যাক মুল পয়েন্টে। গত কয়েক বছর ধরেই সংবাদ কর্মী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে একটা প্রশ্ন বহুবার শুনেছি। বিশেষ করে ইসলামি দলগুলোর সভা—সমাবেশের ক্ষেত্রে খুব কমন অভিযোগ হলো মুলধারার মিডিয়াগুলো তাদের সংবাদ খুব বেশি প্রচার করেনা। তাদের খবর বেশি দেখায়না। এক্ষেত্রে ফেসবুক আর ইউটিউব তাদের জন্য বিরাট গুরুত্বপূর্ন কাজ করছে বলেই দাবি তাদের। তারা ফেসবুক ইউটিউবে যা ইচ্ছা বলতে পারেন। যত খুশি প্রচার করতে পারেন। এখন তাদের প্রশ্নটা যদি হয়, টিভিগুলো কেনো তাদের খবরগুলো ফেসবুক ইউটিউবের মত প্রচার করেনা তাহলেতো বিরাট সমস্যা।

একটা টেলিভিশন বা মুলধারার গণমাধ্যমতো চাইলেই যা খুশি প্রচার করতে পারেনা। তার নানান জায়গায় দায়বদ্ধতা আছে। দর্শকদের প্রতি দায়বদ্ধতা, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতা আছে। তার সময়ের সীমাবদ্ধতা আছে। ফেসবুক বা ইউটিউবে আপনি সারাদিন লাইভ করেন, কথা বলেন কেউ আপনাকে না করবেনা। সময়েরও অভাব নাই, সার্ভারেও জায়গার অভাব নেই। কিন্তু টেলিভিশনে তা কি সম্ভব?
ফলে কেউ যদি টেলিভিশনকে ফেসবুক আর ইউটিউবের মত চিন্তা করেন আর তাদের ইচ্ছেমত সংবাদ প্রচার না করার জন্য অভিযুক্ত করেন তাহেলেই বিপদ। এই বিপদ আমরা টের পেয়েছি হেফাজতের বিভিন্ন সমাবেশ কাভার করতে গিয়ে।
এককভাবে মাত্র কয়েকবছরে হেফাজতের সভা—সমাবেশ বা বিক্ষোভ কাভার করতে গিয়ে যত সাংবাদিক হামলার শিকার হয়েছেন আর কোনো সংগঠন দারা বোধ হয় এমনটি ঘটেনি। সব রাজনৈতিক দলের লোকেরাই সুযোগ পেলে সাংবাদিকদের একহাত নেন। কিন্তু হেফাজতের সমাবেশগুলোতে যা ঘটেছে তা অনেক বেশি নৃশংস।

ব্যক্তিগতভাবে রিপোর্টার হিসেবে আমি হেফাজতের সমাবেশে লাইভ করতে গিয়ে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছিলাম। লাইভে আমি যখন বলেছি লাখ লাখ মানুষ জড়ো হয়ে রাস্তাঘাট বন্ধ করে দিয়েছে। তাদের দাবি হলো, লাইভে বলতে হবে লাখ লাখ না কোটি কোটি তৌহিদি জনতা এখানে এসেছে। আমাকে অন্তত তিন থেকে চারশ লোক ঘিরে রেখেছিল আমি কি বলি তা শোনার জন্য। এমন পরিস্থিতিতে পড়লে আপনি দুনিয়ার সেরা সাংবাদিকটিও কি করতেন আমার জানতে ইচ্ছে করে। এমন পরিস্থিতিতে পড়লেই বোঝা যাবে বাক স্বাধীনতা কাকে বলে, কত প্রকার ও কি কি? হেফাজতের সর্বশেষ হরতাল ও বায়তুল মোকাররমের ঘটনাতেও মুল আক্রোশটা মনে হয় ছিল সাংবাদিকদেও ওপরেই।
বহু মানুষকে দেখি, সাংবাদিকদের বিরুদ্বে একটা কমন অভিযোগ করেন। সাংবাদিকরা আসল খবর দেয়না। সাংবাদিকরা দালাল। ধান্দাবাজ। আরো কত কি বলে। এমনকি আমাদের নিজেদের অনেক সহকমীর্ও একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে এই ধরনের অভিযোগ করেন। এখন কেউ যদি আশা করেন ফেসবুকে যেভাবে সাংবাদিকতা হয়, টেলিভিশন আর মুলধারার পত্রিকাতে্ও একইধারায় সংবাদ করবেন তাহলে আপনি বোকার স্বর্গে বাস করছেন। ফেস—বুক ইউটিউবের খবর আর লাইভ দেখে আপনার যত ভালোই লাগুক তা কখনো মুধরারার বিকল্প হতে পারেনা।

ফেসবুক লাইভের মজা কি তা হোটেলে নারীকে (দাবি স্ত্রী) ধরা পড়ে ভালোই বুঝেছেন মামুনুল হক। এখন ফেসবুকারদেও মত মুলধারার দশটা টেিলিভিশনও যদি এই ঘটনার লাইভ করা শুরু করতো আর ঐ ফেসবুকারদেও মত প্রশ্ন মামুনুল হককে করতো তাহলে অবস্থা কি দাঁড়াতো? তাই ফেসবুক বা ইউটিউব লাইভ দেখেই মনে করার কারণ নেই যে মুলধারা মিডিয়া খবর দেয়না।
ফেসবুক আর ইউটিউবের গুজব সংবাদের কবলে যে একবার পড়েছে সেই বুঝেছে এই মাধ্যম কি জিনিস। আমি বলছিনা যে ফেসবুক থেকে মানুষ ভালো তথ্য পাচ্ছেনা। তবে, এটি কখনোই মুলধারার বিকল্প হতে পারেনা। তাই, প্রতিদিন ফেসবুকে খবর পড়ার সাথে সাথে মুলধারার খবরেও একটু চোখ রাখেন তাহলে বিভ্রান্ত হতে হবেনা। আর সাংবাদিকদের একতরফা গালিও দিতে হবেনা। সুযোগ পেলেই যেই সাংবাদিকদের ওপর হামলা করছেন, মারধর করছেন, তাদের গাড়ি পুড়িয়ে দিচ্ছেন, অশ্লিলণ ভাষায় গালি দিচ্ছেন, আবার তাদের কাছে শতভাগ পেশাদারিত্ব আশা করা দ্বিচারিতা ছাড়া আর কি হতে পারে?

লেখকঃ সাইদুল ইসলাম
সিনিয়র রিপোর্টার, জিটিভি

এশিয়াবিডি/এমকে/কেকে 
আরও সংবাদ
error: You are under arrest !!