রহমতে আলম (ﷺ) : সু-মহান মর্যাদা (পর্ব তিন)


আল্লাহ তায়ালা তাঁর হাবিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এত বেশি সু-মহান মর্যাদা দান করেছেন তা আমাদের জ্ঞান দিয়ে উপলব্ধি করা সত্যিই কঠিন। পবিত্র কুরআন শরীফের প্রায় ৪০ জায়গায় রাব্বুল আলামীন তাঁর নামের সাথে রহমতে আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নাম মোবারক উল্লেখ করেছেন। যেমন সূরা তওবার ৫৪ নম্বর আয়াতে এসেছে- “তাদের ব্যয়সমূহ কবুল হতে বাধা শুধু এটাই যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অবিশ্বাস করেছে এবং নামায অলসভাবে পড়ে আর সব ব্যয় অনিচ্ছায় করে”।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে সম্মানী নামে ডাকা।

আল্লাহ তায়ালা কুরআন শরীফে অনেক নবী রাসূলকে সরাসরি নাম সম্বোধন করে ডেকেছেন। যেমন, ইয়া আদায়, ইয়া নূহ, ইয়া ইব্রাহীম, ইয়া মূসা, ইয়া দাউদ, ইয়া ঈসা ইবনে মারইয়াম, ইয়া যাকারিয়া ও ইয়া ইয়াহইয়া। কিন্তু বিশ্ব নাবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সরাসরি নাম সম্বোধন করে না ডেকে অনেক সম্মানী নাম দিয়ে ডেকেছেন। যেমন, ইয়া আইয়ুহান্নাবী, ইয়া আইয়ুহার-রাসূল, মুহাম্মাদুর রাসূল, ইয়া আইয়ুহাল মুযযাম্মিল, ইয়া আইয়ুহাল মোদ্দাসসির, ইয়াসিন ও ত্বাহা।

 রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সু-মহান চরিত্রের অধিকারী।

সূরা কলমের ৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- “আর আপনি এক সু-মহান চরিত্রের অধিকারী”। সূরা আহযাবের ২১ নম্বর আয়াতে আরো বলেছেন- “তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মাঝে সু-মহান এক আদর্শ রয়েছে। কেবল তার জন্য যে আল্লাহ ও শেষ দিনের সাক্ষাতের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে”।

উক্ত আয়াতে উল্লেখিত (খুলুকীন আযিম) সু-মহান চরিত্র এর অর্থ নির্ধারণে কয়েকটি মত বর্ণিত আছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, এর অর্থ মহৎ দ্বীন। কেননা, আল্লাহ তায়ালার কাছে ইসলাম অপেক্ষা অধিক প্রিয় কোনো দ্বীন নেই। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, স্বয়ং কুরআন শরীফ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সু-মহান চরিত্র। অর্থাৎ কুরআন পাক যেসব উত্তম কর্ম ও চরিত্র শিক্ষা দেয়, তিনি সেসবের বাস্তব নমুনা। হযরত আলী (রাঃ) বলেন, এখানে কুরআন শরীফের শিষ্টাচার বোঝানো হয়েছে, অর্থাৎ যেসব শিষ্টাচার কুরআন শরীফ শিক্ষা দিয়েছে। (কুরতুবী)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নৈতিক চরিত্রের সর্বোত্তম সংজ্ঞা দিয়েছেন হযরত আয়শা (রাঃ), তিনি বলেছেন, কুরআনই ছিলো তাঁর চরিত্র। (মুসনাদে আহমাদ)। সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফের হাদীসে এসেছে- “হযরত আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি দশটি বছর নাবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -এর খিদমত করেছি। কিন্তু তিনি কখনো আমার প্রতি উহ্ শব্দটি করেননি। এ কথা জিজ্ঞেস করেননি, তুমি এ কাজ কেন করলে এবং কেন করলে না”?

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সত্তায় আল্লাহ তায়ালা যাবতীয় উত্তম চরিত্র পূর্ণমাত্রায় সন্নিবেশিত করে দিয়েছিলেন। তিনি নিজেই বলেছেন, আমি উত্তম চরিত্রকে পূর্ণতা দান করার জন্যই প্রেরিত হয়েছি”। (মুসনাদে আহমাদ ও মুস্তাদরাকে হাকিম)। সুতরাং মুসলিমদের উত্তম আদর্শের প্রতীক একমাত্র নাবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তাই তাঁর জীবন ও কর্ম থেকে প্রত্যেক মুসলিম জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের সর্বক্ষেত্রে আদর্শ গ্রহণ করবে। আজ বিভিন্ন দল, তরীকা ও সম্প্রদায়ের অনুসারীরা তাদের নেতা ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তির আদর্শের দিকে আহ্বান করে থাকে। কখনো একজন মুসলিম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আদর্শ বর্জন করে অন্য কোন ব্যক্তির আদর্শ গ্রহণ করতে পারে না। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবনাদর্শে রয়েছে ইহকালীন কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তি। পৃথিবীতে এমন কোন ব্যক্তি নেই যার সকল কথা ও কাজ পালনীয় ও অনুসরণীয়, কেবলমাত্র রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত। একমাত্র রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সমস্ত কথা, কাজ ও অবস্থা আনুগত্য ও অনুসরণযোগ্য। প্রতিটি স্থান, কাল ও পাত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আদর্শ অনুসরণ করলে মুসলিমরা আবার সে স্বর্ণ যুগে ফিরে যেতে পারবে।

 রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর দুরুদ শরীফ পড়া।

সূরা আহযাবের ৫৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- “নিশ্চয় আল্লাহ নাবীর প্রশংসা করেন এবং তাঁর ফেরেশতাগণ নাবীর জন্য দোয়া-ইসতেগফার করেন। হে ঈমানদারগণ! তোমরাও নাবীর উপর সালাত পাঠ কর এবং তাঁকে যথাযথভাবে সালাম জানাও”। হযরত ইমাম বুখারী (রহঃ) হযরত আবুল আলিয়া থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর আল্লাহর সালাত বলতে বুঝানো হয়েছে ফেরেশতাদের কাছে নবীর প্রশংসা এবং ফেরেশতাদের সালাত হলো দোয়া। আর হযরত ইমাম তিরমিযী (রহঃ) সুফিয়ান সাওরী থেকে বর্ণনা করেন যে, এখানে আল্লাহর সালাত বলতে রহমত এবং ফেরেশতাদের সালাত বলতে ইস্তেগফার বুঝানো হয়েছে। (তাফসীর ইবনে কাসীর)।

এ আয়াতে নাবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ঐ সম্মান ও সু-মহান মর্যাদার কথা বর্ণনা করা হয়েছে যা আসমানে উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন ফেরেশতাদের নিকট বিদ্যমান। তা এই যে, আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদের নিকট নাবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সম্মান ও প্রশংসা করেন এবং তাঁর ওপর রহমত বর্ষণ করেন। আর ফেরেশতাগণও নাবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মর্যাদার জন্য দোয়া করেন। তার সাথে সাথে আল্লাহ তায়ালা বিশ্ববাসীকে আদেশ করছেন তারাও যেন নাবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি দরূদ ও সালাম পাঠ করে। যাতে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রশংসায় ঊর্ধ্ব ও নিম্ন উভয় জগৎ একত্রিত হয়ে যায়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি দরূদ পড়ার জন্য উম্মাতের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন। এমনকি পদ্ধতি ও শিক্ষা দিয়েছেন। সহীহ বুখারী শরীফের হাদীসে এসেছে- “হযরত কাব ইবনে উজরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বলা হল, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার উপর সালাম (সম্পর্কে) আমরা অবগত হয়েছি, কিন্তু সালাত কীভাবে? তিনি বললেন, তোমরা বলবে, “আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিও ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ, কামা সাল্লাইতা আলা ইব্রাহিমা ওয়া আলা আলি ইব্রাহীমা ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ। আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদিও ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ কামা বারাকতা আলা ইব্রাহীমা ওয়া আলা আলি ইব্রাহিমা ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ”। অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মাদ এবং মুহাম্মাদের পরিবারবর্গের উপর রহমত নাযিল কর, যেমনিভাবে ইব্রাহীম এর পরিবারবর্গের উপর আপনি রহমত নাযিল করেছ। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত, মর্যাদাবান। হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মদ-এর উপর এবং মুহাম্মাদ এর পরিবারবর্গের প্রতি বারাকাত নাযিল কর। যেমনিভাবে আপনি বারাকাত নাযিল করেছ ইব্রাহীমের পরিবারবর্গের প্রতি। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত, মর্যাদাবান”।

এজন্য নামাজের শেষ বৈঠকে নাবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি দরূদ পাঠ করা ওয়াজিব। আবার কেউ সুন্নাত বলেছেন। তাছাড়া আযান শেষে, মাসজিদে প্রবেশ ও বাহির হওয়ার পূর্বে, জানাযার নামাজে, ঈদের নামাজে, আল্লাহ তায়ালার কাছে কিছু চেয়ে দোয়া করার শেষে ও কবর যিয়ারতের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি দরূদ পাঠ করা মুস্তাহাব। (ইবনে কাসীর)। {দরূদ শরীফ সম্পর্কে আলাদা একটা লেখা হবে ইনশা আল্লাহ}।

 রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাবের মালিক।

আল্লাহ তায়ালা নাবী রাসূলদের প্রতি একশত চারখানা সহিফা ও কিতাব নাযিল করেছেন। তার মধ্য সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাব নাযিল করেছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর। যে কিতাবের মধ্য কোন ধরনের সন্দেহ নেই। এবং এই কিতাব হচ্ছে সমস্ত মানবজাতির জন্য পথনির্দেশ। সূরা বাকারার ২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- “এই তো কিতাব, যাতে কোন সন্দেহ নেই, আছে মোত্তাকীদের জন্য পথনির্দেশ”।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন সর্বশ্রেষ্ঠ মুযিজার অধিকারী। তাঁর মুযিজা হলো সমুদ্রের তরঙ্গমালার মত। তাঁর অসংখ্য মুযিজা রয়েছে, এর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মুযিজা হলো কুরআন শরীফ।

—————-চলবে ইনশা আল্লাহ

লেখক: ইমাম ও খতিব ওল্ডহাম জামে মাসজিদ, যুক্তরাজ্য

এশিয়াবিডি/ডেস্ক/কেকে 
আরও সংবাদ