সিলেটে দলীয় প্রার্থীদের দুশ্চিন্তা ৫ স্বতন্ত্রপ্রার্থী
ভোটের সমীকরণে জটিলতা
ভোটের লড়াইয়ে সিলেটে শেষ পর্যন্ত ৫ স্বতন্ত্র প্রার্থী পাল্টে দিতে পারেন সকল হিসেবে-নিকেস। ইতোমধ্যে তারা দলীয় প্রার্থীদের মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। আলোচনায় না থেকেও তারা এখন আলোচনায়। প্রতিদ্বন্দ্বিতার দৌড়ে পেছনে থেকে তারা এখন সামনের কাতারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, তাদের মধ্যে ২-৩ জন বেরিয়েও আসতে পারেন। এরকম সম্ভাবনা ইতোমধ্যে তারা প্রত্যেকে জাগিয়ে তুলেছেন। ফলে নির্বাচনের মাঠে দলীয় প্রার্থীরা এখন তাদের সমীহ করে প্রচারণা চালাতে হচ্ছে। তাদের মধ্যে ৩ জন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী।
সর্বশেষ মাঠ পর্যালোচনায় দেখা যায়, সিলেট-৫ এ বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মামুনুর রশিদ (চাকসু মামুন), সুনামগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির বিদ্রোহীপ্রার্থী ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেন, সুনামগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন, মৌলভীবাজার-১ আসনে মুফতি বেলাল আহমদ এবং মৌলভীবাজার-২ আসনে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মাওলানা ফজলুল হক খান সাহেদ। এই দুই প্রার্থী বাংলাদেশ আঞ্জুমানে আল ইসলাহ সমর্থিত। দলটি এ দুটি আসন ছাড়া সব আসনে ইতোমধ্যে বিএনপিকে সমর্থন দিয়েছে। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, দলীয় প্রার্থী ওই আসনগুলোতে থাকলেও বিএনপি কৌশলগত কারণে এর কোনো একটিকে ভোটের মাঠে আল ইসলাহর জন্য ছাড় দিতে পারে।
সিলেট-৫ (জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট) : সীমান্ত ঘেঁষা দুই উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিএনপি ও জামায়াত কেউই আসনটিতে নিজেদের প্রার্থী দেয়নি। দুটি দল নিজেদের প্রার্থীদের বঞ্চিত করে জোটের প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছে। বিএনপি জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুককে (খেজুর গাছ) সমর্থন দিয়েছে। অন্যদিকে খেলাফত মজলিসের মুফতি মোহাম্মদ আব্দুল হাসানকে (দেওয়াল ঘড়ি) সমর্থন দিয়েছে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। বিএনপির একাধিক প্রার্থী এ আসনে মনোনয়নের জন্য লড়াই করেছিলেন কিন্তু কাউকেই শেষপর্যন্ত দল মনোনয়ন দেয়নি। বাকিরা দলের সিদ্ধান্ত মেনে বসে গেলেও দলের শীর্ষ মনোনয়নপ্রত্যাশী সিলেট জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি (বহিষ্কৃত) মামুনুর রশীদ (চাকসু মামুন) স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রয়ে যান। তিনি ফুটবল মার্কায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। দলের একটি অংশ, আওয়ামী লীগের একটি বড় ভোট ব্যাংক তার সাথে রয়েছে। ইতোমধ্যে তিনি দলীয় দুই শীর্ষ প্রার্থীকে পেছনে ফেলে আলোচনার শীর্ষে চলে এসেছেন। অনেকের ধারণা শেষমেশ তিনি বেরিয়েও আসতে পারেন। তবে তা না হলে বিজয়ী প্রার্থীকে তার সাথেই কঠিন যুদ্ধ করতে হবে।
স্থানীয়রা বলছেন, এই আসনে খেজুর গাছ, ফুটবল ও দেওয়াল ঘড়ির ত্রিমুখী লড়াই হবে। এ আসনে উপমহাদেশের প্রখ্যাত বুযুর্গ ফুলতলী পীরের দরবারে অবস্থিত। বলা হচ্ছে, যিনি ফুলতলী দরবারের সমর্থন পাবেন, ফলাফল তার পক্ষেই যেতে পারে।
মৌলভীকাজার-১ (বড়লেখা-জুড়ি) : নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, ১৬টি ইউনিয়ন ও ১ টি পৌরসভার মোট ৩ লাখ ৩৭ হাজার ৮১৬ জন ভোটার নিয়ে এই নির্বাচনী আসন। মৌলভীবাজার-১ আসনে মোট ৬ জন প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিএনপির নাসির উদ্দিন আহমেদ (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম (দাঁড়িপাল্লা), জাতীয় পার্টির আহমেদ রিয়াজ উদ্দিন (লাঙল), গণঅধিকার পরিষদের মো. আব্দুন নুর (ট্রাক), গণফ্রন্টের মো. শরিফুল ইসলাম (মাছ) এবং একমাত্র স্বতন্ত্র প্রার্থী মুফতি মাওলানা বেলাল আহমদ (কাপ-পিরিচ) নির্বাচন করছেন। এই আসনে মূল লড়াই হবে বিএনপির নাসির উদ্দিন আহমেদ ও জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলামের মধ্যে। তবে সেটি শেষ পর্যন্ত ত্রিমুখী লড়াইয়ে নিয়ে আসতে পারেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মাওলানা বেলাল আহমদ। ফুলতলী মসলকের অরাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ আঞ্জুমানে আল ইসলাহ তাকে নির্বাচনে সমর্থন দিয়ে মাঠে কাজ করছে। সিলেটের যে দুটি আসনে দলটি বিএনপির বাইরে কাউকে সমর্থন দিয়েছে এ আসন তার একটি। আসনে ফুলতলীর বিশাল একটি ভোট ব্যাংক রয়েছে। রয়েছে আওয়ামী লীগেরও ভোটব্যাংক। ফলে পিছিয়ে থেকেও বেলাল আহমদ মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চলে এসেছেন। বলা হচ্ছে, এ আসনে দুমুখী লড়াইকে ত্রিখুখী লড়াইয়ে নিয়ে আসবেন বেলাল।
মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া) : আসনটি নানা কারণে বেশ আলোচিত। বেশিরভাগ সময়ে এই আসনে শ্রোতের বিপরীতে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। আসনটিতে এবার ৮ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিএনপির মো. শওকতুল ইসলাম (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর মো. সায়েদ আলী (দাঁড়িপাল্লা), স্বতন্ত্র প্রার্থী নওয়াব আলী আব্বাছ খান (ফুটবল), জাতীয় পার্টির মো. আব্দুল মালিক (লাঙল), স্বতন্ত্র প্রার্থী মাওলানা ফজলুল হক খান সাহেদ (কাপ-পিরিচ), স্বতন্ত্র প্রার্থী এম জিমিউর রহমান (ঘোড়া), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আব্দুল কুদ্দুস (হাতপাখা) এবং বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের সাদিয়া নোশিন তাসনিম চৌধুরী (কাঁচি প্রতী) নির্বাচন করছেন। এই আসনে শুরু থেকেই হেভিয়েট প্রার্থী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মাওলানা ফজলুল হক খান সাহেদ। এর আগে তিনি সর্বশেষ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তার আগে দুবার ছিলেন ভাইস চেয়ারম্যান। তাকে সমর্থন দিয়েছে ফুলতলী মসলকের অরাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ আঞ্জুমানে আল ইসলাহ। দলীয় প্রার্থীদের রেখে তিনি আছেন আলোচনার শীর্ষে। দলীয় প্রার্থীরাও তাকে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে প্রচারণা চালাচ্ছেন। মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা ত্রিমুখী। বিএনপির মো. শওকতুল ইসলাম, জামায়াতে ইসলামীর ইঞ্জিনিয়ার মো. সায়েদ আলীর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকবেন ফজলুল হক খান সাহেদÑ এমনটাই বলছেন সেখানকার ভোটাররা।
স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা বলছেন, চা বাগান অধ্যুষিত মৌলভীবাজারের আসনগুলোয় জয় পরাজয়ে বড় নিয়ামক শক্তি ৯২টি চা বাগানের ২ লাখ ৭০ হাজার চা শ্রমিক ভোটার। তারা সাধারণত আওয়ামী লীগের মূল ভোটব্যাংক। এবার আওয়ামী লীগ না থাকলেও তারা হয়ে ওঠতে পারেন জয় পরাজয়ের মূল হাতিয়ার।
সুনামগঞ্জ-৩ (জগন্নাথপুর ও শান্তিগঞ্জ) : ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে যুক্তরাজ্য বিএনপির সদ্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মোহাম্মদ কয়ছর আহমদ ধানের শীষ প্রতীকে এবং বহিষ্কৃত জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেন তালা প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ধারণা করা হচ্ছে, জয় পরাজয়ের মূল লড়াইটা এ দুই প্রার্থীর মধ্যেই হবে। এ ছাড়াও নির্বাচন করছেন জামায়াতে ইসলামীর নেত্রত্বাধিন ১১ দলীয় জোটের শরিক আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) প্রার্থী সৈয়দ তালহা আলম (ঈগল প্রতীক), খেলাফত মজলিসের প্রার্থী শেখ মুশতাক আহমদ (দেয়াল ঘড়ি), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী অ্যাডভোকেট শাহিনুর পাশা চৌধুরী (রিকশা)। মাঠে কাজ করছেন শান্তিগঞ্জ উপজেলার একই গ্রামের দুই স্বতন্ত্র প্রার্থী মাহফুজুর রহমান খালেদ (টেবিল ঘড়ি প্রতীক) এবং হোসাইন আহমদ (ফুটবল প্রতীক)। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জগন্নাথপুর প্রবাসী অধ্যুষিত উপজেলা হওয়ায় জাতীয় অর্থনীতিতে জগন্নাথপুরের প্রবাসীদের অনেক অবদান। নির্বাচনকে সামনে রেখে বিপুল সংখ্যক প্রবাসীরা দেশে এসেছেন। নির্বাচনে প্রাবাসী প্রার্থী হিসেবে যুক্তরাজ্য বিএনপির সদ্য সাবেক সাধারণ স¤পাদক ও জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মোহাম্মদ কয়ছর আহমদ ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন। দুই উপজেলার বিএনপির নেতাকর্মীরা তাকে বিজয়ী করতে জোর প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে তার মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী, বিএনপি থেকে সদ্য বহিষ্কৃত জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেন। দুজনেই ছিলেন বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী। দল কয়ছর আহমদকে মনোনয়ন দিলে আনোয়ার হোসেন বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে থেকে যান। বলা হচ্ছে, এ আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে এ দুজনের মধ্যে। বহিষ্কারাদেশের পর থেকে তার নির্বাচনী পালে নতুন হাওয়া লেগেছে। বিশেষ করে বিএনপির একটি শক্তিশালী অংশ সরাসরি তার পক্ষে মাঠে কৌশলে সক্রিয় রয়েছে। পাশাপাশি এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর কোনো প্রার্থী না থাকায় তাদের একটি ‘ভোট ব্যাংক’ ব্যারিস্টার আনোয়ারের ঝুলিতে আসার জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি জগন্নাথপুর উপজেলায় হেভিওয়েট একাধিক প্রার্থী থাকলেও শান্তিগঞ্জ উপজেলার ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেনই একমাত্র প্রার্থী।
সুনামগঞ্জ-৪ (সদর ও বিশ্বম্ভরপুর): এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন পাঁচজন। এর মধ্যে বিএনপির প্রার্থী দলের জেলা কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির অন্যতম সদস্য নূরুল ইসলাম। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দলটির জেলা নায়েবে আমির মোহাম্মদ শামস্ উদ্দীন। মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন জেলা বিএনপির সাবেক জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ও আহ্বায়ক কমিটির সাবেক সদস্য দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন। তিনি মরমি কবি হাছন রাজার প্রপৌত্র। চারবার সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদ ও একবার সুনামগঞ্জ পৌরসভার নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন। একবার তিনি ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে সুনামগঞ্জ-৩ আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশও নিয়েছিলেন। ফলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েও তিনি দলীয় প্রার্থীদের টক্কর দিয়ে তিনি আলোচনার শীর্ষে চলে এসেছেন। এখানে জামায়াতে ইসলামীর ভোট ব্যাংক বেশ দুর্বল। তবে প্রার্থী মো. শামস উদদীন দলের নেতা-কর্মীদের নিয়ে নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। আসনে অন্য দুজন প্রার্থী হলেন জাতীয় পার্টির নাজমুল হুদা (লাঙ্গল) ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শহীদুল ইসলাম পলাশী (হাতপাখা)। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সুমাগঞ্জ-৩ এর মতন এ আসনেও মূল লড়াই হতে পারে বিএনপি-বিএনপি। আলোচনা বেশি এই দুই প্রার্থীকে নিয়েই।

