আদালতে হিশামের জামিন নাকচঃ মৃত্যুদণ্ডের সম্ভাবনা
২৮ এপ্রিল মঙ্গলবার সকালে ফ্লোরিডার একটি আদালতে হিশাম সালেহ আবুগারবিয়েহর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিচারক রাজ্যের স্টেট অ্যাটর্নির অফিসের পক্ষে রায় দিয়ে আবুগারবিয়েহকে জামিন ছাড়াই আটক রাখার আদেশ বহাল রেখেছেন। ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার দুই বাংলাদেশি ডক্টরাল শিক্ষার্থী জামিল লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টিকে অস্ত্র দিয়ে পরিকল্পিত প্রথম শ্রেণির হত্যার দুটি অভিযোগে অভিযুক্ত আবুগারবিয়েহ আজকের শুনানিতে আদালতে শারীরিকভাবে উপস্থিত ছিল না। সে তার উপস্থিতির অধিকার থেকে নিজেই ছাড় নিয়েছে।
আজকের শুনানিতে প্রসিকিউটররা নতুন এবং শিউরে ওঠার মতো একটি তথ্য প্রকাশ করেছেন। ফোনের ডেটা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৭ এপ্রিল রাত ১টা থেকে ভোর ৫টার মধ্যে — অর্থাৎ জামিল ও বৃষ্টির নিখোঁজ হওয়ার পরের ঘণ্টাগুলোতে — আবুগারবিয়েহ হাওয়ার্ড ফ্র্যাংকল্যান্ড সেতুতে অন্তত ছয়বার গিয়েছিল। এতবার সেতুতে যাওয়ার কারণ কী? তদন্তকারীরা বিশ্বাস করছেন, সে দুই ভিকটিমের মরদেহ ও তাদের জিনিসপত্র একাধিক যাত্রায় সেতু থেকে পানিতে ফেলে দিয়েছে। প্রতিটি যাত্রায় একটু একটু করে সাক্ষ্য নষ্ট করার চেষ্টা করেছে।
প্রসিকিউটররা আদালতকে জানিয়েছেন, তদন্তকারীরা বিশ্বাস করছেন জামিল ও বৃষ্টি উভয়কেই অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরেই হত্যা করা হয়েছে। এরপর মরদেহ ট্র্যাশ ব্যাগে ভরে গাড়িতে করে সেতুতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অ্যাপার্টমেন্টের কার্পেটে পাওয়া মানবাকৃতির রক্তের ছাপ, ড্র্যাগিং ও স্মিয়ারিংয়ের প্যাটার্ন — এসব প্রমাণ এই বক্তব্যকে সমর্থন করছে।
স্টেট অ্যাটর্নির অফিস আদালতকে বলেছে, আবুগারবিয়েহ সমাজের জন্য “উল্লেখযোগ্য বিপদ” এবং তাকে বিচারপূর্ব আটক রাখা আবশ্যক। বিচারক সেই যুক্তি গ্রহণ করে জামিনের আবেদন নাকচ করেছেন। হিলসবোরো কাউন্টির স্টেট অ্যাটর্নি সুজি লোপেজ আগেই ফেসবুক পোস্টে বলেছিলেন, “আবুগারবিয়েহ আমাদের সমাজের জন্য বিপজ্জনক।”
মামলাটি এখন ডিসকভারি পর্যায়ের প্রথম ধাপে রয়েছে। হত্যার দুটি প্রথম শ্রেণির অভিযোগের পাশাপাশি আবুগারবিয়েহর বিরুদ্ধে আরও বেশ কিছু অভিযোগ রয়েছে — শারীরিক প্রমাণ ধ্বংসের চেষ্টা বা নষ্ট করা, অননুমোদিত উপায়ে মৃতদেহ সরানো এবং মৃত্যুর ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা মেডিকেল এক্সামিনারকে না জানানো। এই সব অভিযোগ মিলিয়ে আবুগারবিয়েহর বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী আইনি কাঠামো তৈরি হচ্ছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো মৃত্যুদণ্ড। ফ্লোরিডায় প্রথম শ্রেণির হত্যা একটি ভয়ংকর অপরাধ এবং মৃত্যুদণ্ডযোগ্য। তবে আজ পর্যন্ত প্রসিকিউটররা আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত্যুদণ্ড চাইবেন কিনা তা ঘোষণা করেননি। এই সিদ্ধান্ত মামলার পরবর্তী ধাপে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। আবুগারবিয়েহর পক্ষে বর্তমানে একজন পাবলিক ডিফেন্ডার কাজ করছেন। তারা জানিয়েছেন তাদের মক্কেলের ন্যায্য বিচারের অধিকার রক্ষায় তারা কাজ করে যাচ্ছেন এবং প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করবেন না।
আজকের শুনানির বাইরে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে। জামিল ও বৃষ্টির পরিবার জানিয়েছেন, নিখোঁজ হওয়ার আগে তারা যে অফ-ক্যাম্পাস আবাসন কোম্পানির কাছে রুমমেট সংক্রান্ত অভিযোগ করেছিলেন, সেই অভিযোগ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছিল। পরিবারের দাবি, যদি সেই অভিযোগের যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হতো তাহলে হয়তো এই ট্র্যাজেডি এড়ানো যেত। এই বিষয়টি এখন একটি আলাদা আইনি প্রশ্ন হিসেবে উঠে আসছে — আবাসন সংস্থার দায়িত্ব কতটুকু ছিল।
আদালত একটি স্ট্যাটাস কনফারেন্সের তারিখও নির্ধারণ করেছে যেখানে মামলার পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নির্ধারিত হবে। ডিসকভারি প্রক্রিয়ায় আরও প্রমাণ সামনে আসবে — হিশামের ল্যাপটপ থেকে পাওয়া ডেটা, ফোনের সম্পূর্ণ লোকেশন ইতিহাস, অ্যামাজন অর্ডারের রেকর্ড এবং ৯টা ৪১ মিনিটের সেই ডুপ্লিকেট চাবির ঘটনাসহ সব কিছু একসঙ্গে উপস্থাপিত হবে।
বাংলাদেশে জামিল ও বৃষ্টির পরিবার আজও শোকে ডুবে আছেন। বৃষ্টির মরদেহ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত হয়নি। ২৬ এপ্রিল উদ্ধার হওয়া মানবদেহ তাঁর বলে ধারণা করা হচ্ছে, কিন্তু মেডিকেল এক্সামিনারের চূড়ান্ত রিপোর্ট এখনো আসেনি। পরিবার সেই রিপোর্টের অপেক্ষায়। বাংলাদেশি কমিউনিটি বিচারের দাবিতে একতাবদ্ধ। প্রতিটি শুনানি, প্রতিটি প্রমাণ, প্রতিটি তথ্য — সবই এখন দুটি পরিবারের কাছে ন্যায়বিচারের পথে একটি করে পদক্ষেপ।

